শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

স্মরণ : অধ্যাপক আবু জাফর

প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী
এদেশের মানুষ অধ্যাপক আবু জাফরকে জানে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানের রচয়িতা, সুরকার ও গায়ক হিসেবে। কিন্তু এর বাইরে তাঁর আর একটি পরিচয় যার জন্য তিনি নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থবিত্ত, স্ত্রী সবকিছু ছেড়ে নতুন পরিচয় ধারণ করেছেন এবং তা হলো, অধ্যাপক আবু জাফর হলেন আল্লাহপাকের এক প্রিয়তম বান্দা ও রসুলপ্রেমিক। আমি মাওলানা কামালুদ্দিন জাফরির মন্তব্য শুনেছি, অধ্যাপক আবু জাফর যেভাবে তাওহিদ বুঝেছেন কামালুদ্দিন জাফরিও সেভাবে বুঝেননি। তাঁর বলা ও লেখায় আল্লাহপাকের একাত্ববাদ (তাওহিদ) ও রসুলপ্রেম বারবার প্রকাশ পেয়েছে। যিনি আল্লাহকে নিজের রব ও অভিভাবক হিসেবে মেনে নেন তিনি দুনিয়ার সকল প্রলোভন, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন। হ্যাঁ, অধ্যাপক আবু জাফর তাই ছিলেন। তাঁর কুষ্টিয়ার বাড়ির প্রবেশ পথে লেখা আছে, মুমিনদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ এবং কাফেরদের কোনো অভিভাবক নেই। অধ্যাপক আবু জাফর আল্লাহপাককে রব হিসেবে মেনে নিয়ে তার উপর দৃঢ় ও স্থির থেকেছেন। ফলে ইসলামের পরিপন্থী সবকিছু ছেড়ে আসতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি। মহান আল্লাহপাক তাঁকে সাহায্য করেছেন। আর আল্লাহ তায়ালার বক্তব্যও তাই। তাঁর বাণী-
‘যারা ঘোষণা করেছে, আল্লাহ আমাদের রব, অতঃপর তার ওপরে দৃঢ় ও স্থির থেকেছে নিশ্চিত তাদের কাছে ফেরেশতারা আসে এবং তাদের বলে, ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে’- সুরা হামিম আস-সাজদাহ ৩০।
আবু জাফর স্যারের মা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা। তিনি নিয়মিত মহিলাদের বৈঠকে বসতেন। আমার স্ত্রী সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিনি কালিশংকরপুর আমাদের বাসায় মহিলাদের বৈঠকে আসতেন। মা’র প্রতি স্যার ছিলেন বেশ দুর্বল। একজন ধর্মপরায়ণা মা’র দোয়া আল্লাহপাক উপেক্ষা করতে পারেন না। আমি বলবো, অধ্যাপক আবু জাফরের প্রত্যাবর্তন তাঁর মা’র দোয়ার ফল। দীনের পক্ষে স্যারের সকল খেদমতের সওয়াব তিনি এবং তাঁর মা-বাবা সকলেই পাবেন। তাঁর জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনটা আসে সেটি হজ¦ করার মধ্য দিয়ে। হজ সম্পন্ন করার পর কারো মাঝে যদি আমূল পরিবর্তন ঘটে তাহলে বুঝতে হবে আল্লাহপাক তাঁকে হজে¦ মাবরুর (কবুল হজ¦) দান করেছেন। যাদের নছিবে হজে¦ মাবরুর জুটে তাঁরা দুনিয়া থেকেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হন।
আবু জাফর স্যারের সাথে আমার মেলামেশা ও জানাশোনা ১৯৮৪ সন থেকে এবং আমি ছিলাম তাঁর খুবই কাছের ও ¯à§‡œà¦¹à¦§à¦¨à§à¦¯à¥¤ শুরু থেকেই তাঁকে মাসিক পৃথিবী, মাসিক মদিনা, পাক্ষিক পালাবদল, মাসিক আল ইসলাম (ইংরেজি) পত্রিকা নিয়মিত প্রদান করতাম। কখনই তিনি ইসলামের প্রতি বৈরী ছিলেন না এবং সাধারণভাবে অন্যান্য মুসলিমরা যেভাবে ইসলামকে মানে তিনিও তেমন মানতেন। তাঁর কাছ থেকে সর্বশেষ গান শুনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ শিক্ষক লাউঞ্জে। সেই অনুষ্ঠানে ফরিদা পারভীনসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ছিলেন। অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর ড. এ এস এম আনোয়ারুল করিম। অনুষ্ঠান চলাকালীন আমরা খবর পাই যে ফরিদা পারভীনের পিতা এক্সিডেন্ট করেছেন। আমরা দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাই।
অধ্যাপক আবু জাফর অবসর গ্রহণ করেন ১৪.০৫.১৯৯৭। সংগীতের জগত থেকে প্রত্যাবর্তন করে ইসলামের আলোকজ্জ্বল পথে ফিরে আসা মূলত হজে¦à¦° পর এবং ইসলামের পক্ষে তাঁর লেখনি শুরু হয় ১৯৯৫ সনে। তিনি দৈনিক নয়া দিগন্ত, ইনকিলাব, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, পাক্ষিক পালাবদল, মাসিক পৃথিবী, মাসিক মদিনায় নিয়মিত লিখতেন। আমার মনে পড়ে তিনি মাসিক পৃথিবীতে প্রথম ‘ইসলামে শিল্প ও সৌন্দর্য ভাবনা’ প্রবন্ধটি পাঠান। মাসিক পৃথিবীর সম্পাদক অধ্যাপক নাজির আহমদ অধ্যাপক আবু জাফরকে তখনো সেভাবে জানতেন না। ফলে লেখাটি ফেলে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে পড়ে দেখে তিনি অভিভূত হয়ে পড়েন এবং পৃথিবীতে কয়েক কিস্তিতে ছাপান। একদিন নাজির আহমদ ভাইয়ের সাথে তাঁর অফিসে আবু জাফর স্যার সম্পর্কে আলাপ হলে বলেন, আমি তাঁর প্রবন্ধটি পড়ি এবং বারবার আলহামদু লিল্লাহ উচ্চারণ করি। তিনি ঝড়ো গতিতে লিখতে থাকেন এবং বিভিন্ন পত্রিকার চাহিদামত লেখা দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। বাংলা ভাষায় তাঁর শব্দচয়ন ও লেখনি অসাধারণ এবং হাতের লেখা ছিল অতুলনীয়। তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকতেন। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি যেমন লিখতেন তেমনি বলতেনও। আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা তাঁকে সবকিছুর ভয় থেকে মুক্ত করে দিয়েছিল। আল্লাহপাকের ভালোবাসা লাভের আশায় তিনি সরকারি আনুকূল্য, পুরাতন বন্ধু-বান্ধব সবকিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আল্লাহর পথে অবিচল ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের উচ্চ মর্যাদার কারণ হলো আল্লাহর জন্য তাঁদের ত্যাগ ও কুরবানি। এ যুগে আল্লাহর কোনো বান্দা যদি তাঁর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারে তাহলে সেও আল্লাহর কাছে মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠবেন।
অধ্যাপক আবু জাফরের পরিবারের সাথে আমি খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তাঁর বাসায় আমার অনেক যাতায়াত ছিল। তাঁর ও তাঁর পরিবারের আতিথেয়তা ভুলবার নয়। তাঁর তিন ছেলেমেয়ের বিয়েতে আমি উপস্থিত ছিলাম। আকদ অনুষ্ঠানেও কয়েক জনের মধ্যে আমার উপস্থিতি ছিল। আবু জাফর স্যারের সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণে একদিন অসিয়ত করলেন যে মৃত্যুর পর তাঁর জানাযা যেন আমি পড়াই। দুর্ভাগ্য, আমি সেই সুযোগ পাইনি। হার্ট এ্যাটাকের পর তাঁকে ল্যাব এইডে ভর্তি করার পর স্যারের মেয়ে তাঁর অসুস্থতার কথা জানায়। স্যারের মেয়ে জিহান ফারিয়া জানায় যে CCU-তে ভর্তি করানো হয়েছে এবং ২/৩ দিন পরে প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে। স্যারের অবস্থা এতটা নাজুক আমি তা বুঝতে পারিনি। Global Aid U. K-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. আখতারুজ্জামান সেদিন আমার বাসায় মেহমান। উনি আবু জাফর স্যারকে জানতেন। ফজরের নামায পড়ে তাঁকে সাথে করে বাসায় যাই। লাশ পৌঁছার পরপরই আমরা বাসায় পৌঁছি এবং স্যারের মেজ ছেলে ইমাম নাহিল (সুমন)-কে সাথে নিয়ে দোয়া করি। পূর্ব থেকেই পৌনে দশটায় টিকেট বুকিং দেয়া ছিল। আমরা দুটি পরিবার এসবিতে রওনা হয়ে সিদ্ধান্ত হলো আমি সরাসরি কুষ্টিয়া যাবো এবং বাকিরা বাড়ি যাবে। রাস্তায় ছিল জ্যাম এবং সময়মত পৌঁছার ক্ষেত্রে সন্দিহান হওয়ায় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোল্লা মো. রুহুল আমীন বেলালকে বলে রেখেছিলাম জানাযা পড়ানোর জন্য। অধ্যক্ষ মহোদয় সবকিছু রেডি রেখেছিলেন এবং আবু জাফর স্যারের জানাযা পড়িয়েছিলেন। অধ্যক্ষ রুহুল আমীন বেলাল আমার ও স্যারের একান্ত স্নেহধন্য। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের একজন শিক্ষককে কর্মরত অধ্যক্ষ নিজে জানাযা পড়িয়ে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করায় আমি পরিতৃপ্ত। এটি আল্লাহপাকের একান্ত অনুগ্রহ এবং এমনটি তাঁরই ফয়সালা। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, কলেজের কোনো শিক্ষক মারা গেলে তাঁর লাশ কলেজ চত্বরে এনে জানাযা দিতে চাইলে কলেজ প্রশাসন সর্বোতভাবে সহায়তা করবে। এই সিদ্ধান্তকে আমরা অভিনন্দন জানাই।
অধ্যাপক আবু জাফর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র এবং এই কলেজের বাংলা বিভাগে সুদীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন। মৃত্যুর পরপরই তাঁর বাংলা বিভাগ স্মরণ সভা ও দোয়া করেছেন এবং সেই অনুষ্ঠানে স্যারের ছোট ছেলে অধ্যাপক ইমাম জাফর নূমানী উপস্থিত ছিল। বাংলাদেশ মসজিদ মিশন কুষ্টিয়া জেলা শাখা কলেজ মসজিদে ১০ই ডিসেম্বর আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে এবং সেখানেও তাঁর ছোট ছেলে উপস্থিত ছিল।
এসব আয়োজনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অধ্যাপক আবু জাফরের প্রতি দরদ ও ভালোবাসারই প্রমাণ বহন করে। তাঁর মৃত্যুর পরের দিন ৭ই ডিসেম্বর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কলেজ শিক্ষক কল্যাণ পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত বার্ষিক বনভোজন ছিল। বনভোজনে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান পরিহার করে ২০২৫ সনে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিতব্য বইটি তাঁর নামে উৎসর্গ করার এবং তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে লেখার সিদ্ধান্ত হয়। কলেজ শিক্ষক লাউঞ্জে বনভোজন উপলক্ষে যাত্রার প্রাক্কালে স্যারের মেজ ছেলে ইমাম নাহিল (সুমন) সাক্ষাত করে তার আব্বার জন্য দোয়া চান।
মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। মুসলিম উম্মাহর দুরবস্থার জন্য অধ্যাপক আবু জাফরের প্রাণ কাঁদতো। এই দুরবস্থার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে তাঁর সৃষ্টিশীল অনেক কর্ম রয়েছে। ১৯৯৫ পর থেকে ঝড়োগতিতে তিনি প্রচুর লিখেছেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো গ্রন্থ। তন্মধ্যে- ‘তুমি পথ প্রিয়তম নবী তুমিই পাথেয়’, ‘ইসলামের শত্রুমিত্র’, ‘ইসলাম ও আত্মঘাতী মুসলমান’, ‘মহানবীর (সা.) মহাজীবন’, ‘অসহিষ্ণু মৌলবাদীর অপ্রিয় কথা’, ‘আল্লামা ইকবাল : কবি ও নকীব’, ‘ফার্স্ট থিংস ফার্স্ট (অনুবাদ)’, ‘মোহাম্মদ (সা.) মহাবিপ্লবের মহানায়ক’। তাঁর অপ্রকাশিত অনেক লেখা রয়েছে। হয়তো তাঁকে নিয়ে কোনো ট্রাস্ট গড়ে উঠবে এবং সেই ট্রাস্ট তাঁর অপ্রকাশিত লেখাগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করবে। রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে। তার মধ্যে সদকায়ে জারিয়া, দোয়াকারী নেক সন্তানের দোয়া এবং উপকারী ইলম। এসব বিবেচনায় অধ্যাপক আবু জাফর বড়ই ভাগ্যবান। গত ১০ই ডিসেম্বর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ জামে মসজিদে তাঁর স্মরণে আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠানে স্যারের ছোট ছেলে ইমাম জাফর নূমানী (রাবি) বলেন, আমরা ভাইবোন আব্বার আদর্শ ধারণ করি এবং তাঁর আদর্শ নিয়েই সম্মুখে এগিয়ে যাবো ইনশা-আল্লাহ। তাঁর রেখে যাওয়া লেখনি যুগ যুগ ধরে মানুষকে আল্লাহর পথে চলার ক্ষেত্রে প্রেরণা যোগাবে। আমরা দোয়া করি, আল্লাহপাক তাঁর এই বান্দার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ